আমরা সবাই জানি, হৃদয়ই জীবনের ছন্দ। কিন্তু আজকের ব্যস্ত জীবন, অনিয়ন্ত্রিত খাওয়াদাওয়া আর মানসিক চাপ সেই ছন্দকে অজান্তেই বিঘ্নিত করছে। মজার বিষয় হলো, হার্টের অসুখ অনেক সময় নিজে থেকে শুরু হয় না — বরং অন্য অসুখগুলোই তার পথ তৈরি করে দেয়। যেসব রোগকে আমরা আলাদা করে দেখি, সেগুলিই ধীরে ধীরে হৃদয়ের শত্রু হয়ে ওঠে। তাই জানা জরুরি, কোন কোন রোগ নীরবে হার্টের ওপর চাপ তৈরি করে—যেন সময় থাকতে সতর্ক হওয়া যায়।
১) ডায়াবেটিস : রক্তে অতিরিক্ত চিনি হলো হার্টের সবচেয়ে বড় শত্রুদের একটি। রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ বেশি থাকলে ধীরে ধীরে রক্তনালির দেয়াল শক্ত ও সরু হয়ে যায়। এতে রক্ত চলাচল বাধাপ্রাপ্ত হয় এবং হার্টে পর্যাপ্ত রক্ত পৌঁছায় না। ফলে হার্ট অ্যাটাক বা হার্ট ফেলিওরের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।
২) উচ্চ রক্তচাপ : হাই ব্লাড প্রেসার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। যখন রক্তচাপ বারবার বাড়তে থাকে, তখন হৃদপিণ্ডকে বেশি জোরে কাজ করতে হয়। ফলে হার্টের পেশি মোটা হয়ে যায়, কার্যক্ষমতা কমে, আর একসময় তা ক্লান্ত হয়ে পড়ে। অনেক সময় এই বাড়তি চাপ স্ট্রোক বা হার্ট ফেলিওর ঘটায়।
৩) হাই কোলেস্টেরল : আধুনিক জীবনের এক নীরব আতঙ্ক। অস্বাস্থ্যকর খাবার, জাঙ্ক ফুড ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা রক্তে “খারাপ” চর্বির পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। এই চর্বি ধীরে ধীরে ধমনীতে জমে গিয়ে ব্লক তৈরি করে—যা হার্ট অ্যাটাকের মূল কারণগুলোর একটি।
৪) ওবেসিটির সমস্যা : স্থূলতা বা মোটা হওয়া শুধু ওজন নয়, বরং পুরো শরীরের বিপাকীয় প্রক্রিয়া বদলে দেয়। অতিরিক্ত ওজন রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও ঘুমের সমস্যার ঝুঁকি বাড়ায়, যা শেষ পর্যন্ত হার্টের ওপর বিশাল চাপ ফেলে।
৫) কিডনি ও থাইরয়েডের সমস্যা : এইসব সমস্যা থেকেও হার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কিডনি ঠিক মতো কাজ না করলে শরীরে লবণ ও তরল জমে রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়। থাইরয়েড হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হলে হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক হয়—কখনও বেশি, কখনও কম।
৬) অবশেষে, মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও বিষণ্ণতা—যেগুলোকে আমরা প্রায়ই অবহেলা করি—সেগুলিও হার্টের জন্য সমান ক্ষতিকর। দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেস কর্টিসল হরমোন বাড়িয়ে রক্তচাপ, কোলেস্টেরল ও শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।
হৃদরোগ কখনও একদিনে জন্ম নেয় না; এটি বছরের পর বছর ধরে আমাদের শরীরের অন্য রোগ ও জীবনযাপনের জন্য তৈরি হয়। ডায়াবেটিস, হাইপারটেনশন, স্থূলতা, কিডনি বা থাইরয়েড সমস্যা—সবই একসঙ্গে মিলে হার্টের উপর চাপ সৃষ্টি করে। তাই হার্টের যত্ন মানেই পুরো শরীরের যত্ন। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, পরিমিত খাদ্য, মানসিক প্রশান্তি ও সক্রিয় জীবনযাপনই পারে এই অবিরাম হৃদপিণ্ডকে সুস্থ রাখতে। মনে রাখবেন—আপনার প্রতিদিনের ছোট সিদ্ধান্তই হতে পারে জীবনের বড় রক্ষাকবচ।


