দিবারাত্র খিটখিট করে চলেছেন আপনার ভাই? কিংবা ছোটখাটো কোন বিষয় নিয়েই আপনার বাবা মাথা গরম করে ফেলছেন? প্রায়শই প্রিয়জনের সঙ্গে সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে আপনার পুত্রের? তাহলে একটা কথা পরিষ্কার বুঝে নিন, এনাদের সকলেরই মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি হচ্ছে। এই প্রসঙ্গে জানিয়ে রাখা দরকার, মানসিক সমস্যার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে সামনে আসছে কিশোর ও তরুণদের কথা। তাই সময় থাকতে থাকতে সতর্ক না হলেই বাধবে বিপত্তি। আপনার পরিবারের প্রবীণ বা নবীন যে কোন বয়সী সদস্যরাই এই তালিকায় থাকতে পারেন।
কিন্তু একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে, মানসিক স্বাস্থ্য এক্কেবারে ঠিক নেই জেনেও বহুক্ষেত্রেই দেখা যায় ছেলেরা কোন বিশেষজ্ঞের সহায়তা চায় না।

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, নেপথ্যের কারণ কী? এই বিষয়টি নিয়েই আজকের প্রতিবেদনে বিস্তারিত আলোচনা করা হল। ২০২৩ সালের একটি মার্কিন গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায় যে, ছেলেরা সাধারণত মেয়েদের তুলনায় ৪০ শতাংশ কম সাহায্য চায়। পাশাপাশি, ২০২৪ সালের ইউরোপিয়ান চাইল্ড অ্যান্ড অ্যাডোলেসেন্ট সাইকিয়াট্রি জার্নালে প্রকাশিত এক পর্যালোচনায় বলা হয় যে, মানসিক সমস্যার কারণে কিশোর ও যুবকদের মধ্যে আত্মহত্যার হার বেশি হলেও বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়ার বিষয়ে তাদের তীব্র অনিহার রয়েছে। ফলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অভিভাবক থেকে শুরু করে মনোবিদরা কীভাবে এই বিষয়টি নিয়ে পুরুষদের সাহায্য করতে পারেন, সেই প্রসঙ্গেই বিশ্বজুড়ে চর্চা চলছে।

১) নীরবে কষ্ট সহ্য করার প্রবণতা : সমাজের তৈরী করা আত্মনির্ভরশীলতার ধারণা ও পুরুষদের মধ্যে আবেগ চেপে রাখার প্রবণতাই ছেলেদের সাহায্য চাইতে নিরুৎসাহিত করে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে, ছেলেরা মনে করে ভেতরের দুর্বলতা দেখানো বা প্রকাশ করা মানেই সমাজের চোখে দুর্বল হিসেবে চিহ্নিত হওয়া। ফলে অনেক ছেলেই এখনো সাহায্য চাওয়াকে ব্যর্থতার সমান বলেই মনে করে। এককথায় বলা যায়, ছেলেদের মধ্যে অন্যতম বড় একটা সমস্যা হলো একাকীত্ব।

২) সামাজিক মাধ্যমের ক্ষতিকর প্রভাব : বহুক্ষেত্রেই দেখা যায় সামাজিক মাধ্যম পুরুষত্ব সম্পর্কিত ভুল তথ্য ছড়ায়। বিভিন্ন ওয়েবসাইট, ব্লগ বা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে যখন তথাকথিত পুরুষত্বের ধারণা তুলে ধরা হয় সেটিকে ‘ম্যানোস্ফিয়ার’ বলা হয়। মুভেম্বারের গবেষণায় দেখা গেছে, যারা ‘ম্যানোস্ফিয়ার’ কনটেন্ট বেশি দেখে, তাদের মানসিক স্বাস্থ্য অন্যদের তুলনায় খারাপ। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ছেলে বা যুবকরা সাধারণত বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলা বা নাম প্রকাশ না করে অনলাইনে সহায়তা নিতে বেশি আগ্রহী।

৩) স্কুলের ভূমিকা: স্কুল সংস্কৃতির প্রভাব ছেলেদের ভালো থাকা বা মানসিক স্বাস্থ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পড়াশোনার চাপ অথবা যেখানে ছেলেরা মেয়েদের তুলনায় পিছিয়ে, সেসব জায়গায় উদ্বেগ, হতাশা ও বিচ্ছিন্নতা বাড়িয়ে দিতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্কুলকে ছেলেদের উপযোগী করে নতুনভাবে সাজানো দরকার। স্কুলে আর পাঁচজনের সঙ্গে মিলে ছবি আঁকা, লেখালেখি, গানবাজনা, বাগান করা বা যেকোনও ধরনের হস্তশিল্প মনের খোরাক জোগানোর পাশাপাশি মানসিক প্রশান্তিও এনে দেয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, সৃজনশীল কাজে যুক্ত থাকলে কর্টিসলের মতো স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা কমে। দৈনন্দিন জীবনের ব্যস্ততায় মানসিক চাপ যে এক নিত্যসঙ্গী একথা প্রায় সকলেই বুঝতে পারছেন। সব মিলিয়েই বলা যায়, শারীরিকভাবে তরুণরা আগের চেয়ে সুস্থ হলেও মানসিকভাবে তারা বেশি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে আজকের দিনে এবং তরুণদের মধ্যে আত্মহত্যার সংখ্যা বাড়ছে। ফলে, পরিস্থিতি যে ক্রমাগত বিপদজনক হয়ে উঠছে তা বলাই বাহুল্য।

Leave A Comment

All fields marked with an asterisk (*) are required

Chat with us on WhatsApp
This website uses cookies to enhance your experience.